ঢাকা বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

Popular bangla online news portal

মহান শিক্ষা দিবস আজ


নিউজ ডেস্ক
৬:৩৪ - শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২২
মহান শিক্ষা দিবস আজ

সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের মহান শিক্ষা দিবস আজ (১৭ সেপ্টেম্বর)। ‘পূর্ব বাংলা’র শিক্ষার্থীদের সূচিত শিক্ষা আন্দোলনের ষাট বছর পূর্তির দিন। ১৯৬২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ নাম না-জানা অনেকেই। তাদের স্মরণে এই দিনকে শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

অবশ্য এ বছর দিনটি আরেকটি বিশেষ কারণেও গুরুত্ববহ হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আহূত ‘ট্রান্সফরমিং এডুকেশন’ বা ‘শিক্ষায় রূপান্তর’ শিরোনামে শীর্ষ সম্মেলনের ‘সল্যুশন ডে’ অথবা সংকট উত্তরণ দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।

ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তানের পূর্ব অংশে শোষণ ও বৈষম্যমূলক নীতি অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষা ব্যবস্থায়ও অনুসরণ করা হয়েছিল। বাংলা ভাষার বিকৃতি, রোমান হরফে বাংলা প্রবর্তনের অপপ্রয়াস, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্সহ শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা, ড. মাহমুদ হোসেন, রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতির প্রস্তাব বাঙালির প্রতিরোধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

এ পটভূমিতে পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতিসেবী ও অগ্রণী ছাত্রসমাজ যখন বঞ্চনার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছিলেন, তখন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের মাত্র ২ মাস পর ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। পাকিস্তান শিক্ষা বিভাগের সচিব ও আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তার সাবেক শিক্ষক এসএম শরীফকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। শরীফ কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। এতে শিক্ষা বিষয়ে যেসব প্রস্তাবনা ছিল তা প্রকারান্তরে শিক্ষা সংকোচনের পক্ষে গিয়েছিল।

শিক্ষার উন্নয়নের জন্য শরীফ কমিশনের অর্থসংস্থান সম্পর্কিত প্রস্তাব ও মন্তব্য ছিল- ১. ‘শিক্ষা সস্তায় পাওয়া সম্ভব নয়’, ২. অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুল ও নামমাত্র বেতনের মাধ্যমিক স্কুল স্থাপনের জন্য সরকারের ওপর নির্ভর করাই জনসাধারণের রীতি। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, অবৈতনিক শিক্ষার ধারণা বস্তুত অবাস্তব কল্পনা মাত্র, ৩. শরীফ কমিশনের যে সুপারিশ বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনকে তীব্রতর করে ও আশু কারণ হিসেবে দেখা দেয়, তা হলো, দুই বছরমেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি কোর্সকে তিন বছরমেয়াদি করার সুপারিশ, ৪. আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গ্রেপ্তার।

প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে ছাত্র বেতন বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। ২৭ অধ্যায়ে বিভক্ত শরীফ কমিশনের ওই প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সাধারণ, পেশামূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রসঙ্গ, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, হরফ সমস্যা, প্রশাসন, অর্থবরাদ্দ, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। আইয়ুব সরকার এ রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ এবং তা ১৯৬২ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করে।

শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংকোচন নীতি কাঠামোতে শিক্ষাকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়- প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর। ৫ বছরে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও ৩ বছরে উচ্চতর ডিগ্রি কোর্স এবং ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সের ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়। উচ্চশিক্ষা ধনিকশ্রেণির জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এজন্য পাস নম্বর ধরা হয় শতকরা ৫০, দ্বিতীয় বিভাগ শতকরা ৬০ এবং প্রথম বিভাগ শতকরা ৭০ নম্বর। এই কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার প্রস্তাব করে। শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম করাতে ১৫ ঘণ্টা কাজের বিধান রাখা হয়েছিল। রিপোর্টের শেষ পর্যায়ে বর্ণমালা সংস্কারেরও প্রস্তাব ছিল।

বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আইয়ুবের এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্ব স্ব দাবির ভিত্তিতে জুলাই-আগস্ট মাস জুড়ে আন্দোলন চলতে থাকে। এ আন্দোলন কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। ওই দিন সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে উপস্থিত হন। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়।

জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) গুলি হয়েছে- এ গুজব শুনে মিছিল দ্রুত নবাবপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু হাইকোর্টের সামনে পুলিশ এতে বাধা দেয়। তবে মিছিলকারীরা সংঘাতে না গিয়ে আবদুল গনি রোডে অগ্রসর হয়। তখন পুলিশ মিছিলের পেছন থেকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। এতে তিনজন নিহত হয়। ওই দিন সারাদেশে মিছিলে পুলিশ গুলি করে। টঙ্গীতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশের গুলিতে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিকেরও হত্যার খবর পাওয়া যায়।

৬০তম শিক্ষা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আজ কর্মসূচি পালন করবে। শিক্ষার বাণিজ্য ও শিক্ষার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ছাত্র সমাবেশ করবে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।